শিরোনাম :
শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:৩২ অপরাহ্ন

“ফসলের বীজে হাইব্রিড-ফাঁ’দ”

রিপু / ২৮ বার
আপডেট : শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২

নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিদিনের পোস্ট ||

ফসলের জমিতে বেড়েছে হাইব্রিড ও উফশী জাতীয় বীজের দৌরাত্ম্য। কৃষকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে প্রকৃত ভালো বীজ। অল্প জমিতে অধিক ফসল উৎপাদনের আশায় কৃষক বাহারি মোড়কে বাজারের অজানা বীজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছেন। এ নির্ভরশীলতার কারণে বিদেশি বীজের আমদানি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিদেশি বীজে ভরসা করতে গিয়ে অনেক কৃষক প্রতারিতও হচ্ছেন।

গবেষকরা বলছেন, গুণগত মানসম্পন্ন বীজের অভাবে কৃষকরা নিরাপদ পুষ্টি মানসম্মত ফসল উৎপাদন করতে পারছেন না। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১০-১২ শতাংশ মানসম্মত বীজ (দু-একটি ফসলে ২০ শতাংশ) সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে।

মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত বীজ উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন’ (বিএডিসি)। প্রতিষ্ঠানটির বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিমাণ ১১ বছর ধরে প্রায় একই জায়গায় থমকে আছে। অথচ গবেষকরা বলছেন, ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন বীজের ব্যবহার খুবই জরুরি। মানসম্পন্ন বীজের অভাবে উৎপাদন ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এ তালিকায় রয়েছে ধান, গম, পাট. ভুট্রা, সরিষা, পেঁয়াজ, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের ডাল ও সবজির বীজ।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে সরকার বেসরকারি খাতকে সব ফসলের বীজ গবেষণার সুযোগ দিয়ে বাস্তবসম্মত যুগোপযোগী ‘বীজ আইন-২০১৮’ প্রণয়ন করেছে। উদ্ভিদের জাত সুরক্ষা

ও জাতের অধিকার প্রদানের জন্য উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ আইন-২০১৯ প্রণয়ন করেছে। বীজ আমদানি-রপ্তানি নির্বিঘেœ সম্পন্ন করার জন্য ‘উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ আইন-২০১১ ও বিধি-২০১৮’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া যুগোপযোগী ‘বীজ নীতি-২০১৯’ প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী কয়েক বছরে আইনগুলোর সফল বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের বীজ এশিয়ায় একটি স্থায়ী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিএডিসি সূত্র বলছে, বেসরকারি খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান মানসম্মত বীজ উৎপাদনে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেও বিএডিসি বীজ উৎপাদন বৃদ্ধিতে গতি অনেকটাই কম। গত ১১ বছরে প্রতিষ্ঠানটির বীজ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটি ২০২০-২১ অর্থবছরে বীজ উৎপাদন করেছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫০২ টন, যা ২০১০-১১ সালে ছিল ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫ টন। আর দেশে বিভিন্ন ফসলের জন্য সারাবছর অন্তত ১৩ লাখ টন বীজের চাহিদা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহ করা বীজের মধ্যে আউশ, আমন ও বোরো ধানের পাশাপাশি গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, তেল জাতীয় ফসল, পাট, সবজি ও বিভিন্ন ধরনের মসলা রয়েছে। বাকি বীজের জোগান আসে কৃষক, এনজিও ও বেসরকারি খাত থেকে।

বিএডিসি সূত্র বলছে, দেশে বছরে ধান বীজের চাহিদা ৩ লাখ ৫১ হাজার ১২২ টন। বিপরীতে বিএডিসি সরবরাহ করে ৯৩ হাজার ৪২৪ টন। দেশে আলুর বীজের চাহিদা সবচেয়ে বেশি, বছরে ৭ লাখ ৭৩ হাজার ৩৫৫ টন। এর মধ্যে বিএডিসি সরবরাহ করে ৩৫ হাজার ১৪৭ টন। বিএডিসি ধানের বীজের ২৫ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতে পারে। এর মধ্যে উচ্চফলনশীল ও প্রচলিত জাতের বীজের সরবরাহে বিএডিসি এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু হাইব্রিড ধানের বীজের চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি আসে বেসরকারি খাত থেকে। দেশে ২১৮টি হাইব্রিড জাতের মধ্যে ২০৩টি হাইব্রিড বেসরকারি খাত দ্বারা নিবন্ধিত হয়েছে।

বিএডিসির সদস্য পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান (বীজ ও উদ্যান) বলেন, অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বীজ উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। আমাদের যে জনবল থাকার কথা, তার চেয়ে ৪৭ শতাংশ কম রয়েছে। সে হিসাবে বিএডিসি সক্ষমতার বেশি কাজ করছে। তবে মানসম্মত বীজ উৎপাদন বিএডিসি পিছিয়ে রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ অনুবিভাগের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে বিভিন্ন ফসলের বীজের কৃষিতাত্ত্বিক চাহিদা ছিল ১২ লাখ ৪২ হাজার ৩৫০ টন। এর মধ্যে বিএডিসি সরবরাহ করে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫০২, ডিএই ৩৭ হাজার ৫৪৭, বিএমডিএ ৫২০ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯০৫ টন। সব মিলিয়ে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬৫ টন। বীজের এ জোগান চাহিদার ৩০ শতাংশ।

২০২০-২১ অর্থবছরে আউশ, আমন ও বোরো মৌসুমে ধান বীজের চাহিদা ছিল ৩ লাখ ৫১ হাজার ১২২ টন। জোগানের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১০ হাজার ৭৮২ হাজার টন। এর মধ্যে বিএডিসির জোগান ছিল ৯৩ হাজার ৪২৪ টন, ডিএই ৩১ হাজার ৮৭৪, বিএমডিএ ৩৯৪ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ৮৫ হাজার ০৯০ হাজার টন। মোট জোগান ছিল চাহিদার ৬০ শতাংশ। বাকি ৪০ শতাংশ জোগান কৃষক নিজেই করেন। আউশ, আমন ও বোরো মৌসুমে উপশী জাতের ধান বীজের চাহিদা ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার ৭৮১ টন, স্থানীয় জাত ৩৭ হাজার ৩৭৯ টন, হাইব্রিড ২০ হাজার ৮৫৭ টন এবং বোনা আমনের ২১ হাজার ২০৫ টন। ২০২০-২১ অর্ধবছরে গম ও ভুট্টার বীজের চাহিদা ছিল যথাক্রমে ৪৭ হাজার ৫৯৭ ও ১১ হাজার ৮৫০ টন। মোট দানাদার বীজের চাহিদা ছিল ৪ লাখ ১০ হাজার ৫৬৯ টন। এর মধ্যে বিএডিসি সরবরাহ করে ১ লাখ ৯ হাজার ৭০৪, ডিএই ৩৪ হাজার ৬৬২, বিএমডিএ ৫২০ ও বেসরকারি ৯২ হাজার ২৭০ টন। বাকি বীজের জোগান আসে কৃষক পর্যায় থেকে।

২০২০-২১ অর্থবছরে পাটের বীজের চাহিদা ছিল ৫ হাজার ৬৮১ টন। এর মধ্যে বিএডিসি ৭৩৫, ডিএই ২২ ও বেসরকারি খাত ৫ হাজার ৫০০ টন সরবরাহ করে। ডালজাতীয় ফসলের বীজের চাহিদা ২৯ হাজার ১৫২ টন। এর মধ্যে বিএডিসি ১ হাজার ৯০৭, ডিএই ১ হাজার ২৬৭ ও বেসরকারি খাত থেকে ১২৫ টন সরবরাহ করা হয়। তেলজাতীয় বীজের মোট চাহিদা ২১ হাজার ১০৪ টন। এর মধ্যে বিএডিসি ১৫০২, ডিএই ১২৬৭ ও বেসরকারি খাত থেকে ৪৬০ টন সরবরাহ করা হয়। তেলজাতীয় বীজের জোগান ছিল ৩২২৯ টন।

বর্তমান বীজ দৃশ্যকল্প

আনুষ্ঠানিক বীজ ব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রচেষ্টা ৩০ শতাংশ; আধা আনুষ্ঠানিক বীজ ব্যবস্থায় বেসরকারি খাত এবং এনজিওর মাধ্য ৪০ শতাংশ এবং অনানুষ্ঠানিক বীজ ব্যবস্থায় কৃষকের বীজ ৩০ শতাংশ। সব মিলিয়ে ১০০ শতাংশ বীজের জোগান হয়ে থাকে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং-এর তথ্য বলছে, চলতি বছর দানাদার শস্যের বীজ আমদানি করা হয় ১৪ হাজার ৮৫২ টন, সবজি বীজ ৬১৭৩ টন, ফল বীজ সাড়ে ২১ টন এবং ফুল বীজ ৮২ টন।

বেসরকারি খাতের দখলে সবজি ও হাইব্রিড বীজ

সবজি ও হাইব্রিড বীজের ৯০ শতাংশের বেশি সরবরাহ আসে বেসরকারি খাত থেকে। বেরসকারি খাতের একটি প্রতিষ্ঠান (লাল তীর) প্রতি বছর ১ হাজার টন সবজির বীজ উৎপাদন করে, যেখানে বিএডিসি করে ১১৫ টন।

বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএ) ও লাল তীরের তথ্য বলছে, লাল তীর একাই মোট সবজি বীজের চাহিদার ৩০ শতাংশ সরবরাহ করে। বেসরকারি খাতের বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লাল তীরের পাশাপাশি ব্র্যাক, সুপ্রিম সিড, এসিআই, পেট্রোকম, আফতাব বহুমুখী, ইস্পাহানি অ্যাগ্রো, মল্লিাক সিড, ন্যাশনাল এপ্রিকেয়ার উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বায়ার ক্রপ সায়েন্স ও সিনজেনটা বিজ উৎপাদন করে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইংয়ের প্রধান বীজতত্ত্ববিদ ড. মো. আকতার হোসেন খান বলেন, ‘আমরা মানসম্মত বীজ উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছি। ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা এর উৎপাদন সরকারি বেসরকারি খাত মিলিয়ে ২৫ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছি।’ হাইব্রিড বীজ নিয়ে তিনি বলেন, ‘হাইব্রিড বীজের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলন বেশি হলেও উচ্চ ফলনশীল বা সাধারণ বীজের তুলনায় তিন-চারগুণ বেশি দামে হাইব্রিড বীজ কিনতে হয়। কৃষক পর্যায়ে হাইব্রিড বীজ সংরক্ষণের সুযোগ নেই। সব সময়ই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়।’

 

এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ   রিপু /প্রতিদিনের পোস্ট


এ জাতীয় আরো সংবাদ

Warning: Undefined variable $themeswala in /home/khandakarit/pratidinerpost.com/wp-content/themes/newsdemoten/single.php on line 229

Warning: Trying to access array offset on value of type null in /home/khandakarit/pratidinerpost.com/wp-content/themes/newsdemoten/single.php on line 229